গুলিস্তানের ক্যানভাসার, আমার স্বপ্ন পূরন ও ৪,২০০ টাকার একটা বাঁশ

আসসালামুয়ালাইকুম, নিশ্চই ভাববেন আমি প্রতিনিয়তই টাকা ধরা খাই কেনো? 😀 আসলে ব্যাপারটা তেমন নয়। তখন ২০১২ সাল। আমি সবে মাত্র অনলাইন এর কাজ শিখার চেষ্ঠা করছি। তখন ক্রিয়েটিভ আইটি নামক একটা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি হই আমার জীবনের সর্বপ্রথম ফ্রিলান্সিং বিষয়ক কোর্সে। তখন থেকে একটাই স্বপ্ন অনলাইনে আয় করবো আমি।

যেহেতু চোখে মুখে একটাই স্বপ্ন, সেহেতু আমার তো সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতেই হবে তাই নয় কি? তার মধ্যে যদি কেউ আবার আমাকে বলে যে, আপনার স্বপ্ন পূরন করতে হলে এদিকে আসুন। তাহলে তো কোন কথাই নেই। আমি তখনো ঢাকার তেমন কিছুই চিনতাম না। প্রতিদিন গুলিস্তান হয়ে ধানমন্ডি যেতাম।কোন একদিন ক্লাশ শেষে বাড়িতে ফেরার পথে কেউ একজন বলছে “আপনার স্বপ্ন পূরন করতে হলে এদিকে আসুন, মনের আর কোন আশা অপূর্ন থাকবে না” ব্যাস আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আর কি লাগে জীবনে। পাইয়া গেছি আামার স্বপ্ন পূরনের ট্রামকার্ড। 😀

canvasser

প্রতিকী ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারনত এই ধরনের মজলিস হয় গুলিস্তানে।

সামনে এগিয়ে গেলাম। মাইক দিয়ে অনেক কিছু বলছে। কিছু লোক জড়ো হয়েছে তারই মধ্যে। হঠাৎ দেখলাম বক্তা বলছে “আমার এইখানে এমন লোক ও আছে যে একটা অমানুষ” আমি চমকে গেলাম। আমি আবার সে লোক নয়তো? ভয় পেয়ে গেলাম। বক্তা বললো, সেই অমানুষটা আজ তার মায়ের গায়ে হাত তুলেছে এইখানে আসার আগে!!! আমি চিন্তামুক্ত হলাম। কারন আমি সেই লোক নই। বক্তা ধমক দিয়ে বললো “কে সেই লোক?”

একটা অর্ধ বয়স্ক লোক হাত তুললো। কাদো কাদো কন্ঠে বললো,  “বাবা আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আর কোনদিন এ কাজ করবো না।” বাবা মাফ করে দিলো। যাই হোক, আমার মনে একটাই প্রশ্ন যে, ওরে বাবা! সে কি বড় মাপের লোক যে গরগর করে অতীত বলে দিলো!!

বলে রাখছি যে, আমি তখনো জ্ঞানে পরিপূর্ন ছিলাম না। এক কথায়ই তাকে বিশ্বাস করলাম। সে একটার পর একটা লোকের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত বলে দিচ্ছে। ওরে বাবা। আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, তুই কোন ক্লাশে পড়িস? আমি বললাম অনার্স এ পড়ি। সে বললো ভালো করে পড়িস। আমি বিনয়ের সাথে বললাম, আচ্ছা।

কিছুক্ষন পর বললো, এখনো কে আমাকে বিশ্বাস করিস না? আরো একটা মাঝবয়সী লোক হাত তুললো আর মুচকি হাসলো। বললো, আমি বিশ্বাস করি না আপনাকে। রাগান্বিত হয়ে বাবা বললো, এই বেয়াদব দেখ তোর কি অবস্থা করি আজকে! বলেই কি একটা মন্ত্র পাঠ করে তার দিকে ফু দিয়ে বললো  “দেখতো তোর বংশ রক্ষার হাতিয়ারটা আছে কিনা? ”   লোকটি লুঙ্গি পড়া ছিলো। লুঙ্গি খুলেই হাত দিয়ে একদম সত্যিকারে কান্না করে দিলো। হাতজোর করে বললো, বাবা আপনি আমার ঐটা ফিরিয়ে দিন। এইবার ক্যানভাসার বাবা আবারো জানতে চাইলো  “এইবার বিশ্বাস করিস আমায়?” আর কি লাগে! লোকটি কাদো কাদো কন্ঠে বললো, হ্যা বাবা। আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। 😀

যাই হোক, তখন বললো যারা যারা বিশ্বাস করিস তারা ১০০ টাকা করে দে আমাকে বাবার খুশির জন্য। আমি টাকা বের করে দিলাম। ১০০ টাকাই তো, এমন কোন সমস্যা নেই নিয়ে গেলোও। যাই হোক, তার পর সবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমাকে বললো “তোর কি কোন মনের আশা আছে নাকি? ” জোর গলায় বললাম   “হ্যা, আছে।”

বাবা আামাকে বললো, তুই গোলাপশাহের মাজার জিয়ারত করবি আর একটা সুগন্ধি সাবান দিয়ে আসবি মাজারে। আর আসার সময় মাজারের সামনে দাড়িয়ে মনে মনে বলবি তুই কি চাস জীবনে 😀  আর মাজার জিয়ারত শেষে আমার সাথে দেখা করবি।

জীবনে কখনো মাজারে যাই নাই। তাও একটা সাবান নিয়ে গেলাম মাজারে। হাতে কি একটা বেধে দিলো। মাজারের দিকে মুখ রেখে চোখ বন্ধ করে বললাম “হে আল্লাহ, আমি যেনো অনলাইনে ইনকাম করতে পারি”। মাজারে অনেক ফকির সেজদা করছে। আমার খুব ঘৃনা হলো। আমি বেশ সংবেদনশীল এইসব ব্যাপারে। যদিও মাজারের ‍দিকে মুখ ফিরিয়ে চেয়েছি, আমি আল্লাহর কাছেই চেয়েছিলাম। কোন বাবার কাছে নয়। 😀

যাই হোক, তার কাছে আবার আসলাম। এখানে কেউ নেই, শুধু সে আর আমি একা দাড়িয়ে কথা বলছি। সে বললো সাবান দিয়েছিস? আমি বললাম, হ্যা, দিয়েছি।সে বললো তোর মানিব্যাগটা  দে। সে মানিব্যাগটা চেক করে দেখলো যে সর্বমোট ৪৫০০ টাকার মতো আছে। আমাকে প্রশ্ন করলো, আমাকে টাকা দিতে কি তোর কোন আপত্তি আছে? আমি বললাম যে, নাহ। কোন আপত্তি নাই। পরে না আবার আমার ঐটাও গায়েব করে দেয় 😀 রাজী হয়ে গেলাম।

সে ৩০০ টাকা রেখে বাকি ৪২০০ টাকা হাতে নিয়ে বললো ঐ টাকা গুলি দিয়ে বাড়ি যাবি। কোথাও দাড়াবি না। তোর মনের ইচ্ছা ইনশাআল্লাহ বাবার দোয়ায় পূর্ন হয়ে যাবে। আমি খুশি মনে বাসায় চলে আসলাম। ব্যাপারটা কারো কাছে শেষার করলাম না। কারন বাবা গোপন রাখতে বলেছিলো।

পরে ঘোর কেটেছে যখন বুঝতে পেরেছি যে, সবই সাজানো নাটক ছিলো। আর আমি ছিলাম টার্গেট। বোকা হয়ে গেলাম। আমি ভেবেছিলাম যে, গুলিস্তানের মতো যায়গায় তো আর সে মিথ্যা কথা বলবে না। ঢাকা সম্পর্কে কম জ্ঞান থাকার কারনে এমনটা হয়েছিলো।

এখন আমি আলহামদুলিল্লাহ অনলাইনে বেশ প্রতিষ্ঠিত। ইচ্ছাও পূরন হয়েছে। ঐ বাবার কথা মনে পড়লে হাসি পায়। নিজের ইচ্ছা পূরনের জন্য এতোটাই পাগল ছিলাম যে, ৪ বছর আগে ৪,২০০ টাকা দিতেও হাত কাপেনি। তখন কিন্তু আমার ইনকাম ছিলো একেবারে শূন্য। মাঝখানে ফাও ফাও ৪২০০ টাকা ধান্ধা করে নিলো গুলিস্তানের ঐ ক্যানভাসার।

পুনশ্চঃ ব্লগটি লিখলাম যেনো আপনারা সাবধান হউন।এইসব ধান্ধাবাজদের কথায় কান দিবেন না। ইচ্ছা ও স্বপ্ন থাকলে সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অন্তত ২ বছর মন দিয়ে লেগে থাকুন। সফলতার আব্বুও আপনার কাছে ধরা দিবে। সফলতা কারো বাবা দাদার সম্পত্তি নয়। এটা আপনার পরিশ্রমের বদলে আপনার প্রাপ্য অধিকার।

ফেসবুকে আমি: Shamim Hasan Shakil

সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন
ধান্ধাবাজদের থেকে দূরে থাকুন।

শামীম হাসান

গুলিস্তানের ক্যানভাসার, আমার স্বপ্ন পূরন ও ৪,২০০ টাকার একটা বাঁশ
3 (60%) 3 vote[s]