অনলাইন প্রফেশনালদের বিড়ম্বনা ও কিছু বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা

বন্ধুরা, অনেক দিন ধরেই মোটামুটি অফলাইন মুডে চলে গিয়েছিলাম কারন বেশ কিছু ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে সময় পাড় করছি। লেখালেখি আবার শুরু করার কথা ভাবতেছিলাম। তাই আজ আলোচনা করবো অনলাইন প্রফেশনাল হিসাবে কিছু বিড়ম্বনার কথা। নতুন যুক্ত হতে চাওয়া মানুষদের যুক্তিহীন কিছু আবদার যা হরহামেশাই আমাকে ফেস করতে হয়। যা লিখবো তা সম্পূর্ন বাস্তব ও আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহ। আরো একটা কথা, আমি গ্রামে থাকি। সে কারনে আমার অভিজ্ঞতা একটু ভিন্নধর্মী।

হুযুগে পাবলিকঃ

হয়তো কারো কাছে শুনেছে যে, শামীম অনলাইনে আয় করে ও সে বেশ ভালো আছে। ব্যাস। আমার সাথে যোগাযোগ করলো। তার পর সেই চিরচেনা প্রশ্নঃ “শামীম ভাই, আমি আপনার ব্যাপারে শুনেছি। এখন আমিও আপনার মতো অনলাইনে ইনকাম করতে চাই। আমাকে সাহায্য করুন।” তো কি কি পারেন আপনি?: “আমি তেমন কিছুই পারি না। ভাবছি কম্পিউটার কিনবো। তার পর ইনকাম শুরু করবো।” নিজের মাথাটার মগজগুলো যে রাগে টগবগ করতেছে তা আমি সত্যিই অনুভব করতে পারি। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। এইসব পাবলিকদের আমি নাম দিয়েছি হুযুকে পাবলিক ও সবচেয়ে বিপদজনক পাবলিক। তারা শুধু অনলাইন ই না, যে কোন কমিউনিটিতেই প্রবেশ করুক না কেনো একেবারে সে জিনিসটার রস বের করে ছাড়ে। আমি দু চোখে এই ধরনের হুযুগের পাবলিক দেখতে পারি না।

আর্জেন্ট ইনকাম প্রত্যাশী পাবলিকঃ

এই ধরনের পাবলিক অন্য পেশার হয়। তারা হয়তো জীবনে ব্যর্থ হয়েছে কোথাও না কোথাও। হয়তো জীবনের কোন স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। তারা সাধারনত হতাশ হয়ে থাকে। তারা আর্জেন্ট ইনকাম চায়। অনেকটা এই ধরনের প্রশ্ন: “শামীম ভাই, আমাকে কোন কাজ দিতে পারবেন? যেকোন কাজ ভাই, আসলে খুব সমস্যায় আছি। জীবনে কিছু করতে পারছি না। ভাবছি অনলাইনে ক্যারিয়ার শুরু করবো। আপনার সাহায্য প্রয়োজন। ” এই ধরনের প্রশ্ন পেলে আমি রাগ ও করি আবার তাদের ভেতবের কষ্টটাও বুঝার চেষ্টা করি। কারন আমিও একটা সময় এমন হন্য হয়ে কাজ খুজেছিলাম। যাইহোক, অনলাইনে আর্জেন্ট কাজ নাই। এখানে অন্তত ২ বছর একেবারে ফুলটাইম লেগে থাকলে একটা আউটপুট পাওয়া সম্ভব।

ইউটিউব ক্রেজ পাবলিক:

আরে ভাই! সে আর কি বলবো! এক বিরক্তিকর ও আজব অভিজ্ঞতা।  কে তাদের মাথায় ইউটিউব ঢুকিয়ে দিযেছে কে জানে! খালি বলে ইউটিউবে ভিডিও দিয়েই নাকি ইনকাম হয়। আমি একটা ইউটিউব চ্যানেল খুলে দিতে।  বড্ড বিরক্তি লাগে এইসব শুনলে। মূলত এদের জন্যেই ইউটিউব আজকে এতো কঠিন কঠিন নিয়ম করতে বাধ্য হয়েছে।

দেখাদেখি আগ্রহী হওয়া পাবলিক (ধরন-১):

আমার ফেসবুক পোষ্ট অনেকের ভালো লাগে। এটা হতেই পারে। অনেকে বেশ ভালো অবস্থানে আছে ও তারাও ভালো উপার্জন করছে। কিন্তু তারাও হয়তো কেউ কেউ আমার মতো হতে চায়। ব্যাপারটি যদিও আমার ভালো লাগে ও আমি সমর্থন করি কিন্তু আমি তাদের বুঝাতে পারিনা যে, এখানে ক্যারিয়ার শুরু করার জন্য যে শ্রম দিতে হয় তা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তারা ভাবে যে, আমার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো রাখলেই ভালো পোষ্ট একটা চাকরি আমি ম্যাসেজ করে দিতে পারবো। এই অবস্থায় আমার চোখ উল্টিয়ে মুখ ভেংচী দেওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। কি যে বলবো আমি ভাষা খুজে পাই না।

দেখাদেখি আগ্রহী হওয়া পাবলিক (ধরন-২):

এই ধরনের পাবলিগুলি আমি মোটেও পছন্দ করি না। ধরেন এমন একজন মানুষ যে কয়েকদিন আগেও বলতো যে, “এই অনলাইন আর কয়দিন থাকবো, কয়দিন পরই যাইবো গা”। সেই লোক আমার লাইফষ্টাইল দেখে যদি বলে যে, আমি ও চাইতেছিলাম অনলাইনের কাজটি শিখতে, একটু সাহায্য চাই। তখন আমি বুঝেই নেই যে, যার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নাই কম্পিউটার ও প্রযুক্তির প্রতি সে কিনা এই জগতে ক্যারিয়ার গড়বে! কাজ এর নামে ঠন ঠন আর ভালো কিছু করতে দেখলেই আগ্রহ উতলিয়ে পড়ে এইসব পাবলিকের।

ফুটানি মার্কা পাবলিক ও রাজনৈতিক ষ্টাইল এপ্লাই করা পাবলিক:

কিছু লোক তো অবশ্যই আছে যারা আমার বেশ পরিচিত ও ঘনিষ্ট। তারা বাহিরে গিয়ে ফুটানি করে। বাক্যগুলি অনেকটা এমন, “আরে শামীম তো আমার খুব ঘনিষ্ট, আচ্ছা আমি শামীমকে বলে দেবো। সে একটা ভালো কাজ দিয়ে দিবনে।” পরে ফোন দিয়ে অন্য জনকে কাজ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে। ইশ! এই পাবলিকগুলিকে ক্যামনে বুঝাই যে, এটা সরকারি চাকরির মতো নাহ, প্রাইভেট চাকরির মতোও না। রাজনৈতিক স্টাইল ফ্রিলান্সিং এ কাজে দেয় না রে ভাই :/

অতি উত্‌সাহী পাবলিক:

এরাই সবচেয়ে হাস্যকর। ২০১৩ সালে রাসেল ভাইদের বাসায় তখন আমি। এক লোক একটা মডেম নিয়ে রাসেল ভাইয়ের সাথে দেখা করতে এসেছে। তার বলা কিছু বাক্য ছিলো অনেকটা এমন “রাসেল ভাই, আমি অনলাইনে ইনকাম করতে চাই। দেখেন আমি একটা মডেম ও কিনেছি। আমাকে সাহায্য করুন”। এক দিক দিয়ে কথাটা ঠিকই আছে কিন্তু ফ্রিলান্সিং এর দিক থেকে এভাবে হয় না। সে মডেমটি কম্পিউটারে লাগিয়ে গুগলে সার্চ করে আর আর ফাউন্ডেশনের ভিডিওগুলি দেখতে পারতো। সেটা না করে অন্য জেলা থেকে রাসেল ভাইয়ের সাথে দেখা করাটা একেবারেই যুক্তিহীন। তার ধারনা ছিলো যে, রাসেল ভাইয়ের সাথে দেখা করলেই ইনকাম শুরু হয়ে যাবে।
— এবার আমার কথা বলি। এক লোক বছরখানেক আগে আমার সাথে দেখা করে ফ্রিলান্সিং শেখার জন্য। আমি যা যা গাইড আছে সব বলে দেই। কিন্তু সে কিছুদিন আগে আবার আমার সাথে দেখা করে। তার সাথে বলা কিছু উক্তি:

* সালাম, শামীম ভাই কেমন আছেন?
– জ্বী, ভালো। কি খবর আপনার?
* ভাই, আমি তো এখনো চাই আপনার মতো অনলাইনে আয় করতে। আপনি তো বলেছিলেন কম্পিউটার কিনতে হবে। আমি একটি কম্পিউটার কিনবো। তো শামীম ভাই, অনলাইনে আয় করতে কি কম্পিউটার লাগবেই? মোবাইল দিয়ে হবে না?
আমি: — নীরব! নীরব! নীরব!

অলস পাবলিক:

অনেকে নতুন হিসাবে গাইডলাইন চায়। আমি আমার ওয়েবসাইট Lets Learn Now এর লিংক দিয়ে দেই। তারা এতটাই অলস যে তারা আমাকে ওয়েবসাইটের উত্তর দেওয়া প্রশ্নগুলি বার বার করে। তারা ওয়েবসাইটের লেখাগুলি পড়তে পর্যন্ত চায় না। আবার নাকি তারা অনলাইনে আয় করবে! ভাবলেই মাথা ঘুরে আমার!

সঠিক নিয়ম অনুসরন করা পাবলিক:

এটা বিড়ম্বনা নয়। আমি যেহেতু অনেক লোকদের যুক্তিহীন আবদার লিখেছি তাই এখানে সঠিক নিয়মটি বলে দেওয়ার চেষ্ঠা করছি। অনেকেই বলে, “শামীম ভাই, অনলাইনে আয় করতে আগ্রহী। কিন্তু আমি আগে শিখতে চাই। কি পথে আমি শিখতে পারি আমাকে একটু তথ্য দিযে সহায়তা করুন”। এটি একমাত্র আমার পছন্দের প্রশ্ন তাই তার উত্তরটি দিচ্ছি। এখন ২০১৮ সাল। এমন কোন বিষয় নাই যা গুগল সার্চ করলে পাওয়া যাবে না। তাই, কেউ যদি অনলাইনে ক্যারিয়ার গড়ায় আগ্রহী হোন, তাহলে আপনার মনে যা যা প্রশ্ন আছে তা লিখে গুগলে সার্চ করবেন। আপনার সমাধান পেয়ে যাবেন। তাছাড়া আমার ওয়েবসাইটটি তো আছেই। আপনার জেনে রাখা ভালো যে, আমি কিংবা অন্য কেউ আপনাকে ইনকাম করিয়ে দিবে না। আপনাকে কিছু সঠিক গাইড দিতে পারবে যে ঠিক কোন লাইনে আপনাকে সামনে এগুতে পারবে। খুব কম মানুষই গাইডলাইন চায়, তারা চায় সরাসরি ইনকাম করার জন্য সাহায্য। আসলে এভাবে হয় না! আপনাকেই ইনকাম করতে হবে। তার পরেও যদি কোন জায়গায় আটকে যান তাহলে যে কোন এক্সপার্টকে সরাসরি স্পেসিফিক প্রশ্ন করুন। আশাকরি সমাধান পাবেন। এক্সপার্টদের প্রশ্ন করার আগে এই ব্লগটি পড়ে নিতে পারেন। তাহলে প্রশ্ন করতে সুবিধে হবে।  কেনো অভিজ্ঞ ফ্রিলান্সাররা নতুনদের সাহায্য করতে উৎসাহবোধ করে না?

আপনি যদি অনলাইন প্রফেশনাল হয়ে থাকেন তবে শেয়ার করতে পারেন। আর যদি আপনি যদি নতুন হয়ে থাকেন তাহলে কাউকে বিড়ম্বনায় না ফেলে বাস্তবমুখী চিন্তাভাবনা করুন ও গঠনমূলক সাহয্য চাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনার অনলাইন ক্যারিয়ার জীবন সফল হোক, সেই প্রত্যাশায়।

শামীম হাসান

অনলাইন প্রফেশনালদের বিড়ম্বনা ও কিছু বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা
4.3 (85%) 8 vote[s]